রেকর্ড পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। কিন্তু তবে ২০০২ সালের পর আর ট্রফি ছোঁয়া হয়নি। দীর্ঘ ২৪ বছরের সেই খরা কাটানোর মিশন এবার। উত্তর আমেরিকায় পা রাখা সেলেসাও শিবিরে তাই এবার এক নীরব আত্মবিশ্বাস।
১৯২৫ সালের পর প্রথম কোনো বিদেশি কোনো কোচকে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কার্লো আনচেলত্তির থলিতে আছে সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের রেকর্ড। এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ডই এখন ব্রাজিলের বড় ভরসা। মাঠের দুই প্রান্তেই এবার প্রতিভার ছড়াছড়ি। রক্ষণে যেমন শক্তি, আক্রমণেও তেমনি ধার। এর সাথে বাড়তি বোনাস হিসেবে যোগ হয়েছেন নেইমার জুনিয়র। দলের সেরা এই তারকাই হতে পারেন ট্রফি জয়ের মূল ট্রাম্পকার্ড। হেক্সা মিশন সফল করতে তার পায়ের জাদুই এখন ব্রাজিলের তুরুপের তাস।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ গ্রুপ
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের এক হালকা স্মৃতি যেন ফিরিয়ে আনছে এবারের গ্রুপ ‘সি’। সেবারও একই গ্রুপে লড়েছিল এই তিন দল। সে আসরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ব্রাজিল। এরপর তাদের খেলতে হয়েছিল মরক্কো ও নরওয়ের বিপক্ষে।
তবে এবার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মিশন শুরু হচ্ছে আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। প্রথম পর্বের গ্রুপ ম্যাচগুলোর মধ্যে এই লড়াইটিকেই ধরা হচ্ছে অন্যতম সেরা আকর্ষণ।
মরক্কো পরীক্ষার পর ব্রাজিলের পরবর্তী প্রতিপক্ষ হাইতি। আর সবশেষে মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করবে সেলেসাওরা। ব্রাজিল অবশ্য চাইবে এই শেষ ম্যাচের আগেই যেন তাদের পরবর্তী পর্বের টিকিট পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায়।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ম্যাচের সময়সূচি
তারিখপ্রতিপক্ষসময়ভেন্যু১৪ জুন (রোববার)মরক্কোভোর ৪:০০টামেটলাইফ স্টেডিয়াম, ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি২০ জুন (শনিবার) হাইতিসকাল ৭:০০টালিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া২৫ জুন (বৃহস্পতিবার)স্কটল্যান্ডভোর ৪:০০টাহার্ড রক স্টেডিয়াম, মিয়ামি গার্ডেনস, ফ্লোরিডা
রাউন্ড অব ৩২-এ ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কারা?
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে:
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ ব্রাজিলের সামনে পড়বে গ্রুপ ‘এফ’-এর রানার্স-আপ দল। আর সেই পজিশনে নেদারল্যান্ডস, জাপান কিংবা সুইডেনের যেকোনো একটি দলের থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
২৯ জুনের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে। এই দলগুলোর প্রত্যেকেই কোচ কার্লো আনচেলত্তির দলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে:
তবে ব্রাজিল যদি কোনো কারণে গ্রুপ রানার্স-আপ বা দ্বিতীয় হয়ে শেষ করে, তবে তাদের খেলতে হবে গ্রুপ ‘এফ’-এর চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে। তাই এই গ্রুপের প্রতিটি ম্যাচের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে সেলেসাওদের। অন্যদিকে, গ্রুপ পর্বে যদি হিসেব-নিকেশ একদমই ওলটপালট হয়ে যায় এবং ব্রাজিল তৃতীয় স্থানে থেকে পরের পর্বে ওঠে, তবে শুরুতেই তাদের পড়তে হবে কোনো গ্রুপ চ্যাম্পিয়নের সামনে। সে ক্ষেত্রে পর্তুগাল, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে নামতে হতে পারে দলটিকে।
রাউন্ড অব ১৬-এ ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে:
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যদি ব্রাজিল ‘রাউন্ড অব ১৬’-এ পৌঁছাতে পারে, তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের খেলতে হতে পারে নরওয়ে, সেনেগাল কিংবা আইভরি কোস্টের বিপক্ষে। অবশ্যই তা নির্ভর করবে ওই দলগুলোর নিজ নিজ গ্রুপের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে:
অন্যদিকে, ব্রাজিল যদি গ্রুপ রানার্স-আপ বা দ্বিতীয় হয়ে পরের ধাপে আসে, তবে শেষ ১৬-র ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হতে হতে পারে স্বাগতিক কানাডার। অথবা চেক প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো কোনো দলের বিপক্ষেও মাঠে নামতে হতে পারে সেলেসাওদের।
কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে:
ব্রাজিল যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়, তবে তাদের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে ইংল্যান্ড। ২০০২ সালের বিশ্বকাপের পর এই দুই দল আর মুখোমুখি হয়নি। সেই ম্যাচে রোনালদিনহোর বিখ্যাত লব ডেভিড সিম্যানকে পরাস্ত করেছিল এবং সেই একই ধাপে থ্রি লায়ন্সদের বিশ্বকাপ যাত্রার ইতি টেনেছিল।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে:
ব্রাজিল যদি গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তবে ১৯৯৮ সালের ফাইনালের পুনরাবৃত্তি দেখা যেতে পারে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে ফ্রান্স।
সেমিফাইনালে দেখা হতে পারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা সঙ্গে
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে:
ব্রাজিল যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারে, তবে ফুটবলপ্রেমীরা পেতে পারেন এক চরম রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। শেষ চারের সেই ব্লকবাস্টার ম্যাচে তাদের দেখা হয়ে যেতে পারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সাথে। যদি এই দুই পরাশক্তি সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়, তবে আগামী ১৫ জুলাই আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে সেই মহারণ।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে:
তবে ব্রাজিল যদি গ্রুপ রানার্স-আপ বা দ্বিতীয় হয়ে সেমিফাইনালে ওঠে, তবে বদলে যাবে পুরো দৃশ্যপট। সে ক্ষেত্রে ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে শেষ চারে তাদের জন্য অপেক্ষা করবে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট স্পেন।
ফাইনাল
আগামী ১৯ জুলাই ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের সেই কাঙ্ক্ষিত ফাইনাল ম্যাচটি। গ্রুপ পর্বে দলগুলোর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে শিরোপার লড়াইয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে পারে জার্মানি বা স্পেন, এমনকি ফুটবলপ্রেমীরা দেখতে পারেন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মেগা ফাইনালও।
গ্রুপ ‘সি’ চ্যাম্পিয়ন হলে ব্রাজিলের সম্ভাব্য সমীকরণ
স্টেজগ্রুপপর্বরাউন্ড অব ৩২রাউন্ড অব ১৬কোয়ার্টারসেমিফাইনালপ্রতিপক্ষমরক্কো, নরওয়ে, স্কটল্যান্ডনেদারল্যান্ডস/জাপাননরওয়ে/সেনেগাল/আইভরি কোস্টইংল্যান্ডআর্জেন্টিনাস্পেন/জার্মানি
গ্রুপ ‘সি’ চ্যাম্পিয়ন না হলে ব্রাজিলের সম্ভাব্য সমীকরণ
স্টেজগ্রুপপর্বরাউন্ড অব ৩২রাউন্ড অব ১৬কোয়ার্টারসেমিফাইনালপ্রতিপক্ষমরক্কো, নরওয়ে, স্কটল্যান্ডপর্তুগাল/জার্মানি/ইংল্যান্ডচেক প্রজাতন্ত্র/দ.কোরিয়া/বসনিয়াফ্রান্সস্পেনআর্জেন্টিনা
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্কোয়াড
গত ১৮ মে রিও ডি জেনিরোতে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। আর সেদিন পুরো দল ঘোষণার আলো কেড়ে নেয় একটি বিশেষ নাম।
প্রায় তিন বছর আগে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল ইনজুরিতে পড়েছিলেন নেইমার। এরপর থেকে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সে এসেও নেইমার দলে ডাক পেয়েছেন।
সান্তোসে ফেরার পর নেইমারের পারফর্ম্যান্স অবশ্য খুব একটা আহামরি ছিল না। ফিটনেস সমস্যার কারণে দুটি প্রীতি ম্যাচেও তাকে বাইরে রেখেছিলেন আনচেলত্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মহাতারকাকে দলে নেওয়ার বড় ঝুঁকিটি তিনি নিয়েই নিলেন।
ব্রাজিল দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। তাই অনেক চেনা মুখকে বাদও পড়তে হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ৮টি আন্তর্জাতিক গোল নিয়ে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ স্কোরার রদ্রিগো ইনজুরির কারণে দলে নেই। বাদ পড়েছেন ৪১ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভাও, যার ঝুলিতে আছে ১১৩টি ম্যাচ ও ৪টি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। চেলসি ত্রয়ী হোয়াও পেদ্রো, আন্দ্রে সান্তোস ও এস্তেভাও চূড়ান্ত দলে জায়গা পাননি, যার মধ্যে এস্তেভাও ছিটকে গেছেন ইনজুরির কারণে।
বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালীন আরেকটি ধাক্কা খায় দল। চোটের কারণে স্কোয়াড থেকে ছিটকে যান রোমার ফুল-ব্যাক ওয়েসলি। তার জায়গায় দলে এসেছেন আতালান্তার মিডফিল্ডার এডারসন, যিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাচ্ছেন।
দল ঘোষণায় বেশ কিছু চমকও ছিল। গত মার্চে প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়া বোর্নমাউথের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার রায়ান জায়গা করে নিয়েছেন মূল স্কোয়াডে। তার সাথে দলে আছেন ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো এবং আল-ইতিহাদের অভিজ্ঞ ফ্যাবিনিও।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ৯ সদস্যের এই আক্রমণভাগটি যেকোনো দেশের চেয়ে সবচেয়ে দামি। দলে জায়গা পাওয়ার জন্য ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমার, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, মাথেউস কুনিয়া, এনড্রিক, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে এবং রায়ানদের মধ্যে চলবে তীব্র লড়াই।
কোচ আনচেলত্তির প্রিয় ফর্মেশন ৪-২-৪। এই ছকে শুরুর একাদশে চারজন ফরোয়ার্ড একসাথে খেলার সুযোগ পাবেন। বাকিদের অপেক্ষা করতে হবে সাইড বেঞ্চে, ম্যাচে ইমপ্যাক্ট খেলোয়াড় হিসেবে নামার জন্য।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষকআলিসন, এদেরসন, ওয়েভারতনডিফেন্ডারআলেক্স সান্দ্রো, ব্রেমার, দানিলো, ডগলাস সান্তোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, ইবানিয়েজ, লেও পেরেইরা, মার্কিনিয়োস, ওয়েসলিমিডফিল্ডারব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো, দানিলো সান্তোস, ফাবিনিও, লুকাস পাকেতাফরোয়ার্ডএন্দ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে, মাতেউস কুনিয়া, নেইমার জুনিয়র, রাফিনিয়া, রায়ান, ভিনিসিউস জুনিয়র

Leave a Reply