ফুটবল বিশ্বের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, স্বপ্ন আর উন্মাদনাকে সঙ্গে নিয়ে আজ পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বিস্তৃত এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই আসর শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ফুটবল সভ্যতার নতুন যুগে প্রবেশের ঘোষণা।
প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। আর ৩৯ দিনের এই মহাযজ্ঞের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের মাধ্যমে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরুর আগে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে নিয়ম-নীতিতে। যা ফুটবলপ্রেমিদের জানা দরকার।
নতুন রূপে বিশ্বকাপ
১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত বড় আসর আগে কখনও দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন ৩২ দলের ফরম্যাটে চলার পর এবার দল সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮-এ। অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে চারটি করে দল।
গ্রুপপর্ব শেষে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে উঠবে। তাদের সঙ্গে যোগ দেবে সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল। ফলে এবার প্রথমবারের মতো রাউন্ড অব ৩২ দিয়ে শুরু হবে শিরোপার লড়াই।
দল সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কাতার বিশ্বকাপে যেখানে ম্যাচ হয়েছিল ৬৪টি, সেখানে এবার মাঠে গড়াবে মোট ১০৪টি ম্যাচ।
তিন দেশের উৎসব
উত্তর আমেরিকার তিন দেশকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল আয়োজন। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে মোট ১৬টি শহরে। সবচেয়ে বেশি ১১টি ভেন্যু রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি, ডালাস, হিউস্টন, আটলান্টা, সিয়াটল, ফিলাডেলফিয়া, ক্যানসাস সিটি, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া এবং বোস্টন বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতে উঠবে।
এদিকে মেক্সিকো আয়োজন করবে রাজধানী মেক্সিকো সিটির পাশাপাশি গুয়াদালাহারা ও মনতেরেতে ম্যাচ। অন্যদিকে, কানাডার টরেন্টো এবং ভ্যানকুভারও বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে থাকছে আলোচনায়।
মেসি, নেইমার এবং রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ?
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন দুই কিংবদন্তি—লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করা এই দুই মহাতারকার জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। ফলে সমর্থকদের আবেগও এবার অন্যরকম। ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখতে চলেছেন এই দুই কিংবদন্তির লড়াই।
শুধু মেসি-রোনালদোই নন, ব্রাজিলের নেইমার, ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ, জার্মানির ম্যানুয়েল নয়্যার এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনের মতো তারকাদের জন্যও এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ।
নতুন রাজাদের অভিষেকের অপেক্ষা
একদিকে যখন পুরোনো যুগ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল, ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, ব্রাজিলের ভিনিসিউস জুনিয়র এবং জার্মানির জামাল মুসিয়ালাদের দিকে থাকবে বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের বিশেষ নজর।
এবারের বিশ্বকাপের ফেভারিট যারা
বিশ্বকাপের আগে বাজির বাজার এবং বিশ্লেষকদের আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে ফ্রান্স, স্পেন ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে কাতারে শিরোপা জেতা দলটি এবারও অন্যতম ফেবারিট। তাদের পাশাপাশি গতবারের রানার্স আপ ফ্রান্সও আছে ফেবারিটদের তালিকায়। আর ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনও রয়েছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কাতারে। তাদের সঙ্গে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে রয়েছে ব্রাজিল, পর্তুগাল এবং জার্মানি।
বিশ্বকাপে চমক দেখাতে পারে যারা
বিশ্বকাপ মানেই অঘটনের মঞ্চ। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি আসরেই কিছু দল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দূর এগিয়ে যায়। এবার সেই সম্ভাব্য ডার্ক হর্সের তালিকায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে মরক্কো, জাপান ও নরওয়ের নাম। এছাড়া ক্রোয়েশিয়া, সেনেগাল এবং মেক্সিকোও সম্ভাব্য চমকপ্রদ দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির নতুন যুগ
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ে নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। যেখানে বিশেষ ক্যামেরা এবং বলের সেন্সর মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই অফসাইড শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এবারের বিশ্বকাপে ভিএআর-এর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। ভুল কর্নার সিদ্ধান্ত, ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো কিংবা বিতর্কিত দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মতো বিষয়গুলোও এখন পর্যালোচনা করা যাবে।
সময় নষ্ট রোধে খেলোয়াড় পরিবর্তন, থ্রো-ইন এবং গোল কিকের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আনা হয়েছে। এছাড়া অফসাইড সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক থ্রিডি ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থকদের নির্ঘুম রাত
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে গভীর রাত কিংবা ভোরে। তবে সময়ের এই বাধা কখনোই বিশ্বকাপ উন্মাদনাকে থামাতে পারেনি।
কাতারের মরুভূমি থেকে বিশ্বকাপ এবার পাড়ি জমিয়েছে উত্তর আমেরিকার আকাশছোঁয়া নগরীতে। একদিকে মেসি-রোনালদোর সম্ভাব্য শেষ নৃত্য, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের তারকাদের উত্থান—সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়ে উঠতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় আসরগুলোর একটি।

Leave a Reply