বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের পাগলামির কথা কে না জানে। শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বের মানুষ এখন জানে বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা ঠিক কতখানি। সারা বছরই ফুটবলের খোঁজ খবর রাখেন এ দেশের পাগল ফুটবলপ্রেমীরা। তবে তাদের পাগলামিগুলো চোখে পড়ে বিশ্বকাপ আসলে। ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হয়তো খেলার সুযোগ পায় না, তবে নিজেদের পছন্দের দল নিয়ে দেশের মানুষের পাগলামি নেহাতি কম না।
ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশে এই উন্মাদনা নতুন নয়, বহু পুরোনো। তবে এ দেশের মানুষের পাগলামি ভালোভাবে নজরে আসে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে। দেশের মানুষের পাগলামি সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছিলো তো বটেই, নজর এড়ায়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফারও। ঢাকায় ফুটবল উন্মাদনার কয়েকটি ছবি ফিফা নিজেদের ফেসবুক পেজে আপলোড করে লিখেছিলো, ‘ফুটবলের মতো আর কোনো কিছুই মানুষকে একত্রে নিয়ে আসে না।’
বিশ্বকাপের সময় দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে বিভিন্ন দেশের পতাকা দিয়ে ছেয়ে যায়। কেউ গাছের মগডালে, আবার কেউ কেউ বাড়ির ছাদে পছন্দের দলের পতাকা উড়িয়ে সমর্থন জানান দেন। আবার এমনও প্রতিযোগিতা চলে, যে কার চেয়ে বড় পতাকা তৈরি করতে পারে। আর পছন্দের দলের জার্সি তো আছেই।
চার বছর পর আবারও শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ। আগামী ১১ জুন তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে পর্দা উঠতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের। তবে এবারের আমেজটা একটু ভিন্ন। কেননা এবারই প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে হবে বিশ্বকাপ।
তবে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একটা দুঃসংবাদও আছে বটে। এ দেশের মানুষ বিশ্বকাপের খেলা দেখতে পারবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব এখনও কিনতে পারেনি। বেসরকারি কোনো টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যম ওটিটি (ওভার দ্য টপ) প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্প্রচার স্বত্ব এখনও কিনতে পারেনি।
স্থানীয় কোনো টিভি চ্যানেল বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম সম্প্রচার না করলে দেশের দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ দেখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশি সম্প্রচারমাধ্যমগুলো অনুমোদিত অঞ্চলের বাইরে সরাসরি খেলা দেখাতে পারে না।
এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বত্ব নেয়নি। জানা গেছে, বাংলাদেশে এবার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাছ থেকে স্বত্ব কিনে বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচার করতে হবে।
প্রতি বিশ্বকাপ আসরেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) দর্শকদের জন্য খেলা সম্প্রচার করে থাকে। তবে এবার সম্প্রচার স্বত্বের উচ্চমূল্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিটিভির একটি সূত্র জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব বাবদ প্রায় ১৫১ কোটি টাকা চেয়েছে। কর ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে মোট ব্যয় প্রায় ২০০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মোট অর্থের অর্ধেক ১০ মে’র মধ্যে এবং বাকি অংশ ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এই স্বত্বের আওতায় উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানসহ মোট ১০৪টি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার এবং হাইলাইটস দেখানোর সুযোগ থাকবে।
সাধারণত বাংলাদেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনে টেলিভিশনের মাধ্যমে খেলা প্রচার করে এবং বিজ্ঞাপন থেকে আয় করে থাকে।
২০১৮ বিশ্বকাপে ‘প্যাকেজ নীতিমালা’র আওতায় কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই খেলা সম্প্রচার করা হয়েছিল। সে সময় সম্প্রচার স্বত্বধারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিটিভির মাধ্যমে খেলা দেখানোর সুযোগ পেত। তবে ২০২২ সালে সেই নীতিমালা বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই বছর বিশ্বকাপ শুরুর আগে সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্তে ‘বিশেষ বাজেট’ থেকে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল বিটিভি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির বিষয়ে প্রথমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ করে স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড। পরে মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিটিভির কাছে পাঠায়। গত এপ্রিলে বিটিভি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বত্বের মূল্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়।
এত বড় অঙ্কের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিভিকে সরাসরি ফিফার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে বিনামূল্যে সম্প্রচারের কোনো সুযোগ পাওয়া যায় কি না তা যাচাই করা যায়। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বিটিভি ফিফাকে দুটি ই-মেইল পাঠালেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর মেলেনি। এতে করে বিটিভিতে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড ফিফার কাছ থেকে যে সম্প্রচার প্যাকেজ নিয়েছে, তার আওতায় টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারনেটভিত্তিক সম্প্রচারের অধিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জানা গেছে, তারাও (স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ফিফার কাছ থেকে বেশ উচ্চমূল্যে এই স্বত্ব কিনেছে। এ স্বত্ব পাওয়ার দৌড়ে বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল বলেও জানা গেছে।
এদিকে বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র এক মাসেরও কম সময় বাকি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচার নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত আলোচনায় বসতে হবে। সময়ক্ষেপণ হলে দর্শকদের বড় একটি অংশ বিশ্বকাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।