বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকায় সামান্য আঘাতেও হিপ বা কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে ৫০ বছরের পর হিপ ফ্র্যাকচারের পেছনে অস্টিয়োপোরোসিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসকদের কেউ কেউ এ ধরনের গুরুতর হিপ ফ্র্যাকচারকে এর ভয়াবহতা বোঝাতে ‘হিপ অ্যাটাক’ বলেও উল্লেখ করেন। তাই হাড়ের ক্ষয়কে অবহেলা না করে আগেভাগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
অস্টিয়োপোরোসিস হলে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় ভেতর থেকে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাত, পড়ে যাওয়া বা দৈনন্দিন চাপেও ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ে।
চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি কারণকে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেন—
বয়স বৃদ্ধি: বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। সাধারণত ৩০–৩৫ বছরের পর থেকেই হাড়ের ক্ষয় ধীরে ধীরে শুরু হতে পারে।
মেনোপজ: নারীদের মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে এই হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি: শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি না থাকলে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কীভাবে বুঝবেন অস্টিয়োপোরোসিস হয়েছে?
অস্টিয়োপোরোসিস অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই ধীরে ধীরে এগোয়। তাই শুধু গাঁটে গাঁটে ব্যথা হলেই অস্টিয়োপোরোসিস হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চিকিৎসক অন্বিত ভট্টাচার্যের মতে, হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয়ে ডেক্সা (DEXA) স্ক্যান করা হয়। এই পরীক্ষায় টি-স্কোরের মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব মূল্যায়ন করা হয়। টি-স্কোর -২.৫ বা তার কম হলে সাধারণত অস্টিয়োপোরোসিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে প্রয়োজন না থাকলে নিজে থেকে ডেক্সা স্ক্যান বা ক্যালশিয়াম-ভিটামিনের সাপ্লিমেন্ট শুরু না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই পরীক্ষা ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ক্যালশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দুধ, দই ও ছানা ক্যালশিয়ামের ভালো উৎস। যাঁদের দুধে অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতা রয়েছে, তাঁরা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সয়া মিল্ক বা টোফুর মতো বিকল্প খাবার বেছে নিতে পারেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন সবুজ শাকসবজি, যেমন পালংশাক, নটে শাক, বিনস, বাঁধাকপি, ব্রকোলি ও কড়াইশুঁটিও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটের সমন্বয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত।
বিশেষ করে অল্প বয়সে মেনোপজ হয়েছে এমন নারীদের হাড়ের স্বাস্থ্যের বিষয়ে বাড়তি সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাড়ের ক্ষয় রোধে জীবনযাপনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং মদ্যপান নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।
মনে রাখবেন: অস্টিয়োপোরোসিস অনেক সময় নীরবে এগোয়। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, মেনোপজ বা অন্য ঝুঁকির কারণ থাকলে নিজের মতো করে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

Leave a Reply