যে ভি’টামিনের অ’ভাবে বাড়তে পারে থা’ইর’য়েডে’র ঝুঁ’কি

থাইরয়েডের সমস্যা এখন অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে, অটোইমিউন থাইরয়েড ডিজিজ বা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের থাইরয়েড গ্রন্থির ওপর আক্রমণ করার সমস্যাটি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। পুষ্টির ঘাটতি, বংশগত প্রবণতা এবং পরিবেশগত নানা বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতির সঙ্গে অটোইমিউন থাইরয়েড রোগের সম্পর্কের ইঙ্গিত মিলেছে।

তবে কোনো একটি ভিটামিনের অভাবই যে সরাসরি থাইরয়েড রোগের কারণ, এমন প্রমাণ নেই। তাই রোগের ঝুঁকি কমাতে সুষম খাবার, প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

কোন ভিটামিনের অভাবের সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক রয়েছে?

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে এই ভিটামিনের ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিসের মতো অটোইমিউন থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কম পাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে এই সম্পর্ক থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিই রোগের কারণ। রোগের কারণে ভিটামিনের মাত্রা কমছে, নাকি ঘাটতি রোগের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখছে—তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ভিটামিন সম্পূরক

এ ছাড়া ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম ও জিঙ্কের ঘাটতিও থাইরয়েডের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, অটোইমিউন থাইরয়েড রোগের সঙ্গে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি একসঙ্গে দেখা যেতে পারে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে না।

অটোইমিউন থাইরয়েডের ঝুঁকি কমাতে কী খাবেন?

থাইরয়েডের সুস্থতা বজায় রাখতে প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর উপাদান রাখা জরুরি। যেমন-

১. ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার

ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ এবং ভিটামিন ডি-যুক্ত দুধ বা অন্যান্য ফোর্টিফায়েড খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। সূর্যালোকের সংস্পর্শেও শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তবে কারও ঘাটতি থাকলে শুধু খাবার বা সূর্যালোক দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

২. ভিটামিন বি১২-যুক্ত খাবার

মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ভিটামিন বি১২-এর ভালো উৎস। নিরামিষভোজীদের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২-যুক্ত ফর্টিফায়েড খাবার বা চিকিৎসকের পরামর্শে সম্পূরক গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

৩. সেলেনিয়ামসমৃদ্ধ খাবার

মাছ, ডিম, মাংস ও বিভিন্ন বাদামে সেলেনিয়াম পাওয়া যায়। এই খনিজ থাইরয়েড হরমোনের বিপাক এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তবে অতিরিক্ত সেলেনিয়াম গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

৪. জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার

মাংস, সামুদ্রিক খাবার, ডাল, বাদাম ও বীজে জিঙ্ক পাওয়া যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্বাভাবিক কোষীয় কার্যক্রমে এই খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. আয়োডিনযুক্ত লবণ পরিমিত পরিমাণে

থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে আয়োডিন অপরিহার্য। তবে আয়োডিনের অতিরিক্ত গ্রহণও কিছু মানুষের থাইরয়েডের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই আয়োডিনযুক্ত লবণ পরিমিত ব্যবহার করা উচিত; নিজে থেকে আয়োডিনের উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ঠিক নয়।

কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?

অটোইমিউন থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি বা সয়াজাতীয় খাবার স্বাভাবিক পরিমাণে খেলে অধিকাংশ মানুষের থাইরয়েডের ক্ষতি হয় না। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত আয়োডিনযুক্ত সাপ্লিমেন্ট বা সামুদ্রিক শৈবালের ঘন নির্যাস গ্রহণ করা এড়িয়ে চলা ভালো।

সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলাও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক ধড়ফড় করা কিংবা গলায় ফোলা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসক থাইরয়েড-স্টিমুলেটিং হরমোন (টিএসএইচ), ফ্রি টি৪ এবং নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, শুধু ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি পূরণ করলেই অটোইমিউন থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধ করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সঠিক রোগ নির্ণয়, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবারই থাইরয়েডের স্বাস্থ্য ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *