রা’তে দীর্ঘ স’ময় শু’য়ে আছেন কিন্তু ঘু’ম আসছে না, জেনে নিন ১২ উ’পায়

রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে আছেন, অথচ ঘুম আসছে না। ঘড়ির কাঁটা রাত ২টা, ৩টা পেরিয়ে যায়। অনেকের তো ফজরের আজানও কানে আসে। এ রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়তো কমবেশি আমরা অনেকেই হয়ে থাকি। কখনও কি ভেবে দেখেছেন, সারাদিন এত পরিশ্রম করার পরও কেন রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না?

আসলে আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাস বা জীবনযাত্রার ভুলই অনেক সময় রাতের গভীর ঘুম কেড়ে নেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘুম না আসার পেছনে বড় কারণ হতে পারে আপনার ‘স্লিপ হাইজিন’ বা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি ঠিকঠাক না থাকা।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঘুমের গুণগত মান বাড়াতে আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি-

স্লিপ হাইজিন বা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি কী?

স্লিপ হাইজিন হলো এমন কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, যা আপনার শরীরের ভেতরের ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ কে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। আমাদের ঘুমাতে যাওয়া এবং জেগে ওঠার প্রক্রিয়াটি এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য ভালো ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। আর এই ভালো ঘুম পাওয়ার জন্য শুধু রাতের বেলা কী করছেন সেটাই বড় নয়, আপনার সারাদিনের কার্যক্রমও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে। সারাদিনের খাওয়াদাওয়া, কায়িক শ্রম, মানসিক চাপ সামলানো এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনি কী করছেন- সবকিছুই কিন্তু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো ঘুমের জন্য আপনার স্লিপ হাইজিন উন্নত করার ১২টি উপায় সম্পর্কে জেনে নিন-

ঘুমের একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে চলুন

প্রতিদিন রাতে কখন ঘুমাতে যাবেন এবং সকালে কখন ঘুম থেকে উঠবেন তার নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নিন। ছুটির দিনেও এই সময়ের বাইরে যাওয়া যাবে না। একই রুটিন মেনে চললে আপনার শরীর অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে ঘুমানোর সময় হলেই নিজে থেকে ঘুম পেয়ে যায় এবং সকালে উঠতে আর কষ্ট হয় না। এ ছাড়া দিনের বেলা ভাতঘুম কমাতেও এটি বেশ কার্যকর।

আপনার বয়স অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ থাকে, এমন একটি সময় বেছে নিন। যাই হয়ে যাক না কেন, ওই নির্দিষ্ট সময়েই ঘুমাতে যান।

ঘুমের আগে রিল্যাক্সিং রুটিন তৈরি করুন

ঘুমানোর আগে মানসিক চাপে রাখতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন। যতটা সম্ভব রিল্যাক্স থাকার চেষ্টা করুন। ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে থেকে শরীর ও মনকে শান্ত করার প্রস্তুতি নিন। এমন কিছু করতে পারেন যা আপনাকে মানসিক শান্তি দেয়। তবে ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভইসে সময় কাটাবেন না।

তাহলে কী করবেন?

হালকা গরম পানিতে গোসল: গোসলের পর শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি চলে আসে। এটি সাময়িকভাবে মন ভালো করে দেয়। এ ছাড়া গোসলের পর শরীরের তাপমাত্রা একটু কমে যায়, তখন আপনাআপনি একটা ঝিমুনি ভাব চলে আসে।

স্ট্রেচিং বা ব্যায়াম: শরীরের পেশির টানটান ভাব ও ক্লান্তি দূর করতে হালকা ব্যায়াম বা ইয়োগা করতে পারেন।

মেডিটেশন: মাত্র কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে মন শান্ত করার চেষ্টা করলে দুশ্চিন্তা অনেকটা দূর হয়।

পছন্দের গান বা বই পড়া: মন ভালো করে এমন হালকা মিউজিক শুনতে পারেন। কিংবা কোনো বই পড়তে পারেন। অবশ্যই বইয়ের হার্ডকপি পড়তে হবে, ফোনে পিডিএফ পড়া যাবে না।

ঘুমানোর আগে মোবাইল বা গ্যাজেট থেকে দূরে থাকুন

স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে এক ধরনের উজ্জ্বল নীল আলো নির্গত হয়। এটি আমাদের শরীরে ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের উৎপাদনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। এই মেলাটোনিন হরমোনই মূলত আমাদের ঘুম আনতে সাহায্য করে। তাছাড়া ঘুমানোর সময় পাশে ফোন থাকলে বারবার নোটিফিকেশনের শব্দ বা ভাইব্রেশনের কারণে ঘুম ভেঙে যায়, যা আপনার সারারাতের ঘুম নষ্ট করে দেয়। তাই রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে সরিয়ে রাখুন। সুযোগ হলে বেডরুমে কোনো ডিভাইসই রাখবেন না।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যাসও আপনার ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে সকাল বেলায় যদি নরম রোদে কিছুটা সময় হাঁটা যায়, তাহলে আপনার শরীরের ঘুমের চক্রকে আপনি নিজেই সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন, ঘুমানোর আগে ৩ ঘণ্টার মধ্যে কোনো ভারী ব্যায়াম করা যাবে না। কারণ অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম শরীরকে সজাগ করে দিতে পারে। যার ফলে সহজে আর ঘুম আসতে চায় না। রাতের দিকে হালকা স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করা যেতে পারে।

ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করুন

সন্ধ্যার দিকে আমাদের অনেকেরই চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। এখানেই আমরা বড় ভুলটা করি। ক্যাফেইন আপনাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাঙ্গা করে তুললেও এর প্রভাব আপনার শরীরে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ দুপুরের দিকে খাওয়া এক কাপ কফি আপনার রাতের ঘুম পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই কফি বা চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা সকালের দিকেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করুন। তবে একেকজনের শরীরে এর প্রভাব একেক রকম হতে পারে।

শোয়ার ঘরের পরিবেশকে আরামদায়ক করুন

আপনার ঘুম কতটা গভীর তা আপনার বেডরুমের পরিবেশ কেমন, তার ওপরও অনেকটা নির্ভর করে। বেশিরভাগ মানুষের জন্য শোবার ঘরের আদর্শ তাপমাত্রা প্রায় ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকা ভালো। আপনার নিজের প্রয়োজন বুঝে আরামদায়ক তোশক, বালিশ এবং চাদর ব্যবহার করুন। বেশি পুরোনো বা দেবে যাওয়া তোশক ব্যবহার করবেন না।

আপনার যদি হালকা শব্দেও ঘুম ভেঙে যায়, তবে কানের প্লাগ বা হোয়াইট নয়েজ মেশিন ব্যবহার করতে পারেন। ঘরে যেন আলো না থাকে, সে জন্য ভালো মানের ডার্ক কার্টেন বা আই-মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিছানা শুধু ঘুমের জন্যই ব্যবহার করুন

বিছানায় থাকতে আরাম লাগে বলে অনেকেই সারাদিন বিছানায় থাকেন। বিছানায় শুয়েই ল্যাপটপে অফিসের কাজ করা, ফোনে কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া করা, মুভি দেখা বা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। কিন্তু এই অভ্যাসগুলো আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কাছে ভুল বার্তা পাঠায়। মস্তিষ্ক যেন বিছানাকে শুধু ‘ঘুমের জায়গা’ হিসেবেই চেনে, সেই অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিছানায় গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলে ব্রেন সজাগ হয়ে যায়, ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না।

ঘুম না আসলে অযথা বিছানায় শুয়ে থাকবেন না

চোখে ঘুম নেই অথচ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন। অকারণে শুয়ে থেকে বিরক্ত না হয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ুন। ঘর থেকে বের হয়ে এমন কিছু করুন যা আপনাকে রিল্যাক্স করতে পারে। যেমন- সোফায় বসে বই পড়া বা হালকা ব্যায়াম করা। যখন সত্যি সত্যি ঘুম পাবে, কেবল তখনই বিছানায় ফিরে যান। অকারণে বিছানায় ছটফট করলে মানসিক চাপ ও বিরক্তি আরও বেড়ে যায়।

দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস কমিয়ে ফেলুন

দুপুরের খাবারের পর অনেকেরই ভাতঘুমের অভ্যাস আছে। কিন্তু দুপুরের দিকে অনেকক্ষণ ধরে ঘুমালে রাতে আর ঘুম আসতে চায় না। যদি একান্তই দুপুরের দিকে একটু বিশ্রাম বা ন্যাপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তবে তা যেন ১৫ বা ২০ মিনিটের বেশি না হয়। বিকেল পার হয়ে যাওয়ার পর তো একেবারেই ঘুমানো উচিত নয়।

ঘুমানোর আগে মানসিক চাপ দূর করুন

মাথার ভেতর নানা দুশ্চিন্তা আর পরদিনের কাজের টেনশন নিয়ে ঘুমাতে গেলে মন কিছুতেই শান্ত হতে পারে না। আপনি চাইলেও ঘুমাতে পারবেন না। । এই সমস্যা এড়াতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা ডায়েরিতে আপনার সমস্ত দুশ্চিন্তা বা পরদিনের জরুরি কাজগুলো লিখে ফেলতে পারেন। কাগজ কলমে লিখে ফেললে মস্তিষ্ক অনেকটাই হালকা বোধ করে। এ ছাড়া মেডিটেশনের মাধ্যমেও অনেকে দুশ্চিন্তা দূর করতে পারেন।

রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন

ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত বা ভারী খাবার খেলে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিডিটির সমস্যাও হতে পারে, যা আপনার রাতের ঘুম পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে। তাই রাতে হালকা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া ঘুমের আগে অ্যালকোহল বা নিকোটিন পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন। কারণ এগুলোও ঘুমের গুণগত মান নষ্ট করে দেয়।

পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো গায়ে লাগান

দিনের বেলায় অন্তত ৩০ মিনিট সূর্যের আলোতে সময় কাটানো আপনার শরীরের ভেতরের ঘড়িকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্যের আলো গায়ে লাগালে রাতে ভালো ঘুম হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই কাজের ফাঁকে দিনের বেলা কিছুটা আলো-বাতাসের সংস্পর্শে আসার অভ্যাস করুন।

ভালো ঘুম সুস্থ ও সুন্দর জীবনের মূল ভিত্তি। আপনার ছোট ছোট কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমেই আপনি রাতে গভীর ঘুম পেতে পারেন। তবে এই নিয়মগুলো মেনে চলার পরও যদি আপনার দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা লেগেই থাকে, তবে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ এর পেছনে আপনার অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যাও থাকতে পারে।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হেলথলাইনে ‘12 Healthy Sleep Hygiene Tips’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *