বাজার থেকে ডিম কিনে বাসা-বাড়িতে নিয়ে আসার পর অধিকাংশ পরিবারের গৃহিণী বা সদস্যরা প্রথমে যে কাজটি করেন, তা হলো ডিম ভালোভাবে ধুয়ে তারপর সংরক্ষণের জন্য রেখে দেন। যা খুবই স্বাভাবিক বলে জানা আমাদের। কারণ, ডিম পরিষ্কার মানেই তা খাওয়ার জন্য নিরাপদ। এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়, ডিমের খোসা পরিষ্কার করলেই কি সব জীবাণু দূর হয়? নাকি ভুলভাবে ধোয়া ও সংরক্ষণের কারণে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
ডিম পরিষ্কার কিংবা নিরাপদ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টির ব্যাপারে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশলী আশিকা আইনিন নাহার বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে ডিমের খোসার গঠন, জীবাণুর আচরণ এবং প্রতিদিনের রান্নাঘরের অভ্যাসের মধ্যে। আবার ডিমের খোসা আমাদের চোখে শক্ত ও অটুট মনে হলেও এটি পুরোপুরি বন্ধ কোনো আবরণ নয়।
আশিকা আইনিন নাহার বলেন, খোসার মধ্যে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। এগুলোর মাধ্যমে ডিমের ভেতর ও বাইরের পরিবেশের মধ্যে গ্যাসের আদান-প্রদান হয়। তবে প্রকৃতি ডিমকে শুধু শক্ত খোসা দিয়ে ছেড়ে দেয়নি। ডিমের খোসার বাইরের দিকে থাকে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক আবরণ, যাকে বলা হয় কিউটিকল বা প্রাকৃতিক আবরণ। এটি বাইরের জীবাণু ডিমের ভেতরে প্রবেশের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, ডিমের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু খোসা নয়―খোসার বাইরের প্রাকৃতিক সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
➤ ডিমে জীবাণুর ভয় কোথায়:
ডিমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত জীবাণুগুলোর একটি হলো স্যালমোনেলা (Salmonella)। এই ব্যাকটেরিয়া খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাবার দেখতে পরিষ্কার হলেই যে সেটি জীবাণুমুক্ত, এমনটা নয়। একটি ডিমের খোসা বাইরে থেকে দেখতে একদম পরিষ্কার মনে হতে পারে, কিন্তু খালি চোখে দেখে তার ভেতরে বা বাইরে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু আছে কি-না, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ কারণেই খাদ্য নিরাপত্তায় শুধু ‘দেখতে পরিষ্কার’ হওয়া যথেষ্ট নয়।
➤ ডিম ধুয়ে নিলে কি সমস্যা হবে:
বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে ডিম ধোয়ার সময় আমরা সাধারণত টিউবওয়েল বা ট্যাপের পানি ব্যবহার করি। কিন্তু পানির তাপমাত্রা, ডিমের তাপমাত্রা, পানির চাপ এবং ধোয়ার পদ্ধতি সবসময় নিয়ন্ত্রিত থাকে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে ডিমের বাইরের জীবাণু খোসার ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে ভেতরের দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ডিম ধোয়ার সময় সিঙ্ক, হাত, কাপড় বা রান্নাঘরের বিভিন্ন পৃষ্ঠে কাঁচা ডিমের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
এটিই পারস্পরিক জীবাণু ছড়িয়ে পড়া (Cross-contamination)―এক জায়গা বা খাবার থেকে অন্য জায়গা বা খাবারে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া। অর্থাৎ, ডিম ধুয়ে নিলাম, তাতে ডিম এখন আরও নিরাপদ, এই ধারণাটি সবসময় সঠিক নয়।
➤ আমাদের অভ্যাসটা কেমন:
বাংলাদেশে বাজার থেকে ডিম এনে অনেক পরিবারই পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর সংরক্ষণ করেন। এর পেছনের উদ্দেশ্যও ভালো, ময়লা দূর করা, ডিম পরিষ্কার রাখা এবং পরিবারের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে: পরিষ্কার করা আর নিরাপদ করা, দুটি এক জিনিস নয়। কোনো খাবারকে নিরাপদ করতে হলে শুধু তার ওপরের ময়লা সরানো নয়; জীবাণু কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে খাবার সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, তা সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
➤ তাহলে কি ডিম ধোয়া যাবে না:
এ ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া জরুরি। ডিম কখনো ধোয়া যাবে না, এমন সরল সিদ্ধান্তও দেয়া ঠিক নয়। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিম উৎপাদন ও বাণিজ্যিকভাবে পরিষ্কার করার পদ্ধতি এক নয়। কিছু দেশে নিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ডিম পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু বাড়িতে টিউবওয়েল বা ট্যাপের পানিতে ডিম ধুয়ে তারপর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা এবং বাণিজ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ডিম পরিষ্কার করা, দুটি এক বিষয় নয়। তাই সাধারণ ভোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিম অপ্রয়োজনে ধুয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ না করা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা।
➤ ডিম নিরাপদ রাখার উপায়:
অপ্রয়োজনে ডিম ধুয়ে সংরক্ষণ করবেন না―শুধু পরিষ্কার দেখানোর জন্য ডিম ধুয়ে রেখে দেয়ার প্রয়োজন নেই।
ফাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত ডিমের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। খোসা ফেটে গেলে বাইরের জীবাণু ডিমের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে।
কাঁচা ডিম ধরার পর হাত পরিষ্কার করুন। কাঁচা ডিম ধরার পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেয়া উত্তম।
রান্নাঘরের পৃষ্ঠ পরিষ্কার রাখতে হবে। কাঁচা ডিমের সংস্পর্শে আসা পাত্র, কাউন্টার বা অন্যান্য জায়গাও পরিষ্কার রাখা ভালো।
কাঁচা ডিমের সংস্পর্শে আসা খাবার থেকে অন্য খাবারকে দূরে রাখুন। বিশেষ করে রান্না করা বা সরাসরি খাওয়া যোগ্য খাবারের সঙ্গে কাঁচা ডিমের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
ডিম ভালোভাবে রান্না করে খেতে হবে। ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম ভালোভাবে জমাট হওয়া পর্যন্ত রান্না করা খাদ্যজনিত জীবাণুর ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সবশেষ পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশলী আশিকা আইনিন নাহার বলেন, আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা রয়েছে। গৃহিণীরা মনে করেন, ভালো করে ধোয়া হলেই জীবাণু চলে যাবে; যা ভুল। বাস্তবে খাবারের জীবাণু নিয়ন্ত্রণ এত সহজ নয়। পানি দিয়ে ধোয়া সব ক্ষতিকর জীবাণু দূর করার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং ভুলভাবে ধোয়া, সংরক্ষণ এবং রান্নাঘরে পানি ছিটকে পড়ার মাধ্যমে জীবাণু অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে লক্ষ্য হওয়া উচিত―শুধু খাবার পরিষ্কার করা নয়, বরং জীবাণুর বিস্তারও বন্ধ করতে হবে।

Leave a Reply