‘হেরে ঈদে একটা মেন্দি কিইন্যা দেয়াম’

‘আমারে হে বিয়া করছে দয়া কইর‌্যা না, ভালোবাইস্যা। এইবায় (এইভাবে) তো ২০ বছর গেছে গা। মাঝে মধ্যে টুটকা-টাটকা একটু আধটু কাইজ্যা ছাড়া আর কিছুই অইছে না। এইবায় ভিক্ষা কইর‌্যাই জীবন চলতাছে।

তয় ভালোবাসা একটু কমছে না।’

স্ত্রী রাশিদা বেগমকে নিয়ে ভিক্ষা করতে এসে কথাগুলি বলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দ্বীন ইসলাম (৪৫)। শুক্রবার (২০ মার্চ) দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভার নতুন বাজার এলাকায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। 

দ্বীন ইসলাম আরো বলেন, ‘আমারে লইয়া সারাডা দিন ঘুরে, যা পাই তা দিয়া জীবন চলে।

কাইল ঈদ, বাড়িত যাওনের সময় হেরে একটা মেন্দি (মেহেদি) ও চুড়ি কিইন্যা দেয়াম।’ তিনি জানান, অন্ধ হলেও স্ত্রী তাকে মানুষের দ্বারে দ্বারে নিয়ে যান। দুজনে মিলে ভিক্ষা করেন। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আত্মবিশ্বাসের কারণে তাদের সংসারে সুখের কোনো অভাব নেই।

সংসার নিয়ে দ্বীন ইসলাম জানান, তাদের রয়েছে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এক ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন, অপরজন মাদরাসায় পড়ে। দুজনের ভিক্ষাবৃত্তিতেই চলছে এই জীবন। 

কিভাবে অন্ধ হলেন—জানতে চাইলে দ্বীন ইসলাম জানান, জন্মের তিন বছর পর থেকেই তার দুই চোখে সমস্যা দেখা দেয়।

বিনা চিকিৎসায় চোখ দুটি দৃষ্টি হারায়। এরপর ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। ১৫-১৬ বছর বয়সে কোনো এক সময় রাশিদার সঙ্গে কথা হয় তার। এরপর থেকে তার সাহায্য চাইলে বিনা বাধায় রাজী হন তাকে নিয়ে পথ চলার। পরিবারের সম্মতি নিয়ে রাশিদা বিয়েতে রাজি হন। 

দ্বীন ইসলামের স্ত্রী রাশিদা বলেন, ‘একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে বিয়ে করলাম দুইজনে একসাথে থাকতে পারবো বলে। আজকাল গরিবের বিয়ে টিকে না। স্বামী ফেলে রেখে চলে যায়। উনি আমাকে ফেলে রেখে যাবেন না। নিজের জন্য হলেও এটা কোনো সময় করবেন না।’ তিনি জানান, স্বামীকে নিয়ে বের হলে সরা দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা কামাই হয়। এ দিয়ে ভালোভাবেই জীবন চলে। তার ওপর রয়েছে স্বামীর প্রতিবন্ধী ভাতা। এখন একটি ফ্যামেলি কার্ড পেলেই ভালো হবে।

ঈদের দিন কী করবেন—জানতে চাইলে রাশিদা জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্বামীকে নিয়ে ঈদের দিন বিকেলে বের হবেন। ওই দিন একটু বেশি আয়ও হবে, ভালো-মন্দ খাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে সন্তানদের জন্য আনা যাবে। স্বামী মেহেদি কিনে দিলে কী করবেন—জানতে চাইলে রাশিদা বলেন, ‘রাইতে আতো (হাত) দিয়াম। স্বামী চোখে না দেখলেও আত দিয়া চইতে কইয়াম।’ এরপর একটি হাসির কোরাস দিয়ে চলে যান দুজন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *