কা’শি ছাড়াই ফু’সফু’সের রো’গের ই’ঙ্গিত দিতে পারে শ’রীরের এই পরিবর্তনগুলো, জেনে নিন

ফুসফুসে কোনো সমস্যা হলে কাশি হবেই, এমন ধারণা অনেকের। তাই কাশি না থাকলে অনেকে ধরে নেন ফুসফুস ভালো আছে। কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের ফুসফুসের রোগের শুরুতে কাশি দেখা যায় না। কখনো শ্বাসকষ্ট, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, বুক ভার লাগা বা দৈনন্দিন কাজের সময় আগের তুলনায় বেশি হাঁপিয়ে যাওয়াই হতে পারে প্রথম সতর্ক সংকেত।

কিছু দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ ধীরে ধীরে বাড়ে। ফলে শরীরের পরিবর্তনগুলোও প্রথম দিকে খুব সামান্য মনে হতে পারে। বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিবর্তন বা শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণ ভেবে অনেকে এসব লক্ষণ এড়িয়ে যান। অথচ নতুন কোনো শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নেওয়ার ধরন বদলে গেলে তার কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

কাশি না থাকলেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে

ফুসফুসের সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা সামান্য কাজ করার পর আগের তুলনায় বেশি হাঁপিয়ে গেলে সেটিকে শুধু বয়স বা শরীরের ফিটনেসের অভাব বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

বিশেষ করে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই শ্বাসকষ্ট হলে বা সময়ের সঙ্গে সমস্যা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অ্যাজমা, COPD, ফুসফুসের ফাইব্রোসিসসহ বিভিন্ন ফুসফুসের রোগে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।

সামান্য কাজেই আগের চেয়ে বেশি ক্লান্তি

আগে যে কাজ সহজেই করতে পারতেন, এখন সেই কাজ করলেই যদি অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগে, বিষয়টি খেয়াল করুন। ফুসফুস শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ফুসফুসের কার্যক্ষমতায় সমস্যা হলে শারীরিক পরিশ্রম সহ্য করার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

তবে ক্লান্তি শুধু ফুসফুসের রোগের লক্ষণ নয়। রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, হৃদ্‌রোগসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকলে কারণটি পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

বুক ভার বা অস্বস্তি

বুকে চাপ, ভারী লাগা বা অস্বস্তিকেও অবহেলা করা ঠিক নয়। কিছু ফুসফুসের রোগে বুকের অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে শ্বাস নেওয়ার সময় ব্যথা বাড়লে বা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

তবে বুকের ব্যথা শুধু ফুসফুসের সমস্যার জন্য হয় না। হৃদ্‌রোগসহ আরও গুরুতর কারণ থাকতে পারে। হঠাৎ তীব্র বুকব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ

শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো বা শোঁ শোঁ শব্দ হলে সেটিকে wheezing বলা হয়। শ্বাসনালি সরু হয়ে গেলে এমন শব্দ হতে পারে। অ্যাজমা ও COPD-এর মতো রোগে এটি দেখা যায়।

নতুন করে এমন শব্দ শুরু হলে বা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ শ্বাসনালিতে কোনো ধরনের বাধা বা সংকোচন আছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ

ঘন ঘন ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ হলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কিছু দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে বারবার এমন সংক্রমণ হতে পারে।

বিশেষ করে একই ধরনের সমস্যা বারবার হলে শুধু প্রতিবার ওষুধ খেয়ে উপসর্গ কমানোর বদলে এর পেছনে কোনো দীর্ঘস্থায়ী কারণ আছে কি না, তা চিকিৎসকের মাধ্যমে খুঁজে দেখা দরকার।

অকারণে ওজন কমে যাওয়া

খাবার বা শরীরচর্চায় কোনো পরিবর্তন না এনেও যদি ধীরে ধীরে ওজন কমতে থাকে, সেটি নজরে রাখুন। কিছু দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যেতে পারে।

তবে অকারণে ওজন কমার পেছনে ক্যানসার ছাড়াও থাইরয়েডের সমস্যা, সংক্রমণ, হজমের সমস্যা বা অন্যান্য কারণ থাকতে পারে। তাই এই লক্ষণ দেখলেই কোনো নির্দিষ্ট রোগ ধরে নেওয়া উচিত নয়।

আঙুলের ডগা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া

কিছু দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আঙুলের ডগা ও নখের আকৃতিতে পরিবর্তন হতে পারে। একে clubbing বলা হয়। এতে আঙুলের ডগা তুলনামূলক চওড়া ও গোল হয়ে যেতে পারে এবং নখের আকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যায়।

এটি ফুসফুসের নির্দিষ্ট কোনো একটি রোগের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। তবে এমন পরিবর্তন নতুন করে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কাশির সঙ্গে রক্ত এলে দেরি নয়

কাশি না থাকলেও ফুসফুসের সমস্যা হতে পারে, তবে কাশি হলে তার সঙ্গে রক্ত আসা বিশেষভাবে গুরুত্বের বিষয়। ফুসফুস বা শ্বাসযন্ত্রের অন্য অংশ থেকে রক্ত আসতে পারে এবং এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

কাশির সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে কারণ নিজে থেকে অনুমান না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন

ধূমপান ফুসফুসের রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তবে শুধু ধূমপায়ীরাই যে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হন, তা নয়। পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ, কর্মক্ষেত্রে ধুলো বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ এবং কিছু জেনেটিক কারণও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই ধূমপান না করলেও দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসযন্ত্রের অন্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।

ফুসফুস ভালো রাখতে কী করবেন

ফুসফুস সুস্থ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ধূমপান না করা। যারা ধূমপান করেন, তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া যেকোনো বয়সেই উপকারী। পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও ফুসফুসের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

কাশি না থাকলেই নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়

ফুসফুসের রোগের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও দীর্ঘদিন কাশি থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে শুরুতে প্রধান সমস্যা হতে পারে শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া। কিছু রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণও স্পষ্ট নাও হতে পারে।

তাই নতুন বা বাড়তে থাকা শ্বাসকষ্ট, বুকের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ কিংবা কাশির সঙ্গে রক্তের মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ থাকলেই ফুসফুসের গুরুতর রোগ হয়েছে এমন নয়, তবে কারণটি দ্রুত জানা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ থাকে।

সূত্র: এই সময় অনলাইন

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *