না’রী-পু’রুষের কার কতটুকু পা’নি পা’ন করা উ’চিত? জেনে নিন

আমাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। তবে ‘প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করতে হবে’— এই বহুল প্রচলিত নিয়মটি আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু আসলেই কি সবার জন্য পানির চাহিদা একই?

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিষয়ক জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘হেলথলাইন’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন মানুষের প্রতিদিন ঠিক কতটুকু পানি পান করা উচিত তা মূলত তার ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

আমেরিকার স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অফ মেডিসিন’-এর একটি গবেষণার ভিত্তিতে চিকিৎসকেরা জানান, পানির এই প্রয়োজনীয়তা মূলত বয়স, লিঙ্গ, দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম এবং বিশেষ কিছু স্বাস্থ্যগত বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয়।

আসুন জেনে নেওয়া যাক, আমাদের শরীরে পানির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং নারী-পুরুষের কার দৈনিক কতটা পানি পান করা উচিত।

কার কতটুকু তরল বা পানি প্রয়োজন?

ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন-এর সুপারিশকৃত পর্যাপ্ত গ্রহণের মাত্রা (Adequate Intake বা AI) অনুযায়ী বয়স ও লিঙ্গভেদে তরল গ্রহণের দৈনিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো—

১. প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ (১৯ বছর বা তার বেশি)

পুরুষ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক সামগ্রিকভাবে প্রায় ৩.৭ লিটার (বা ১৩১ আউন্স) তরল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে খাবার বা পানীয় বাদে অন্তত ১৩ কাপ (বা ১০৪ আউন্স) পানি সরাসরি তরল পানীয় থেকে আসতে হবে।

নারী: একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর দৈনিক সামগ্রিকভাবে প্রায় ২.৭ লিটার (বা ৯৫ আউন্স) তরল প্রয়োজন। যার মধ্যে অন্তত ৯ কাপ (বা ৭২ আউন্স) পানি সরাসরি তরল পানীয় থেকে আসতে হবে।

উল্লেখ্য, আমাদের দৈনিক মোট তরল চাহিদার একটি বড় অংশ কিন্তু আমরা যে খাবার খাই (যেমন ফলমূল ও শাকসবজি), তা থেকেও আমাদের শরীর পেয়ে থাকে।‌

২. অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের বিশেষ চাহিদা

গর্ভধারণ বা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ে শরীরে তরলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীর দৈনিক অন্তত ৮০ আউন্স বা ১০ কাপ পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর স্তন্যদায়ী মায়ের জন্য দৈনিক প্রায় ১০৪ আউন্স বা ১৩ কাপ পানি পান করা প্রয়োজন।

৩. শিশু ও কিশোর-কিশোরী

শিশুদের পানির চাহিদা তাদের বয়সের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়—

৪ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশু: দৈনিক ৪০ আউন্স বা ৫ কাপ পানি।

৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশু: দৈনিক ৫৬ থেকে ৬৪ আউন্স বা ৭ থেকে ৮ কাপ পানি।

১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী: দৈনিক ৬৪ থেকে ৮৮ আউন্স বা ৮ থেকে ১১ কাপ পানি।

কখন পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে?

আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন চাহিদার বাইরেও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পানির পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে—

ব্যায়াম বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম: আপনি যদি নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তবে আমেরিকান কাউন্সিল অন এক্সারসাইজ (এসিই)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যায়াম শুরু করার ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে ১৭ থেকে ২০ আউন্স এবং ব্যায়ামের ঠিক আগে ও পরে আরও ৮ আউন্স পানি পান করা উচিত। যদি ব্যায়াম এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে, তবে তরল গ্রহণের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে।

উষ্ণ আবহাওয়া ও উচ্চতা: অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,২০০ ফুটের বেশি উঁচুতে অবস্থান করলে শরীরে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পায়।

অসুস্থতা: আপনার যদি জ্বর, বমি বা ডায়রিয়া হয়, তবে শরীর দ্রুত পানি হারায়। এই সময়ে শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি এবং প্রয়োজনে ইলেকট্রোলাইইট সমৃদ্ধ খাবার স্যালাইন বা পানীয় পান করা উচিত।

কেন পানি পান করা এত জরুরি?

আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর মতে, শরীরের প্রতিটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সচল রাখতে পানি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। পানি পানের মূল উপকারিতাগুলো হলো:

শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে বজায় রাখা।

হাড়ের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলগুলোকে পিচ্ছিল ও সুরক্ষিত রাখা।

মেরুদণ্ড এবং অন্যান্য সংবেদনশীল টিস্যুকে সুরক্ষা দেওয়া।

প্রস্রাব, ঘাম ও মলত্যাগের মাধ্যমে শরীর থেকে বর্জ্য দূর করা।

এছাড়াও, ২০১৮ সালের একটি গবেষণার দীর্ঘ পর্যালোচনা অনুযায়ী, পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের বৃহত্তম অঙ্গ অর্থাৎ ত্বক সুস্থ, সতেজ এবং আর্দ্র থাকে।

কম বা বেশি পানি পানের ঝুঁকি

সীমার চেয়ে কম কিংবা বেশি উভয় প্রকার পানি পানই শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—

পানিশূন্যতা: শরীর যখন গ্রহণের চেয়ে বেশি পানি বা তরল হারায়, তখন ডিহাইড্রেশন ঘটে। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মুখ ও জিব শুকিয়ে যাওয়া, চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়া (শিশুদের ক্ষেত্রে), অল্প বা গাড়ো প্রস্রাব হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিভ্রান্তি এবং মেজাজের পরিবর্তন। তীব্র ডিহাইড্রেশনের ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

হাইপোনাট্রেমিয়া: খুব দ্রুত অতিরিক্ত পানি পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অতিরিক্ত হ্রাস পেতে পারে, যা হাইপোনাট্রেমিয়া বা ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ নামে পরিচিত। এর ফলে মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, ক্লান্তি, বমি ভাব, পেশির টান এবং গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি বা কোমা হতে পারে। সাধারণত শিশু, ছোট গড়নের মানুষ এবং ম্যারাথন দৌড়বিদদের মতো অ্যাথলেট যারা দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর দ্রুত অতিরিক্ত পানি পান করেন, তাদের এই ঝুঁকি বেশি থাকে।

সহজেই হাইড্রেটেড থাকার কিছু টিপস

ব্যস্ততার মাঝেও নিজেকে হাইড্রেটেড রাখতে এই সহজ অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে পারেন—

১. পানিযুক্ত খাবার গ্রহণ: তরমুজ, পালংশাক, শসা, সবুজ ক্যাপসিকাম, ব্লুবেরি, ফুলকপি, মুলা ও সেলারির মতো পানি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি বেশি পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখুন।

২. বোতল সঙ্গে রাখুন: জিমে, অফিসে বা ভ্রমণের সময় সবসময় নিজের সঙ্গে পানির বোতল রাখার অভ্যাস করুন।

৩. তরল বা পানীয়ের বৈচিত্র্য: শুধু সাধারণ পানিই নয়; চিনি ছাড়া দুধ, চা বা ব্রথ (ঝোল) থেকেও শরীরে পানির চাহিদা পূরণ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত সোডা, জুস বা অ্যালকোহল জাতীয় চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।

৪. পানিতে ভিন্ন স্বাদ যোগ করুন: সাধারণ পানির একঘেয়েমি দূর করতে পানিতে কিছুটা তাজা লেবু বা কমলার রস চিপে নিতে পারেন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *