সকালে খালি পে’টে চি’য়া সি’ড খা’ওয়ার উ’পকা’রিতা, জেনে নিন 

প্রতিদিন সকালের শুরুতেই এক গ্লাস পানিতে ভেজানো চিয়া সিড- স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এই অভ্যাস। ক্ষুদ্র এই বীজে রয়েছে প্রচুর খাদ্যআঁশ, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন খনিজ।

তবে খালি পেটে খেলেই যে অন্য সময়ের তুলনায় বাড়তি কোনো জাদুকরী উপকার মিলবে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। বরং নিয়মিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে চিয়া সিড খাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কেন সকালের খাবারে চিয়া সিড?

চিয়া সিডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো- এর উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ। হার্ভার্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ টেবিল চামচ বা ২৮ গ্রাম চিয়া সিডে প্রায় ১১ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ৪ গ্রাম প্রোটিন এবং ৭ গ্রাম অসম্পৃক্ত চর্বি থাকে। একই পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও জিঙ্কের মতো খনিজও পাওয়া যায়।

পানিতে ভিজলে চিয়া সিডের চারপাশে জেলির মতো স্তর তৈরি হয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি পেটে কিছুটা বেশি সময় ধরে তৃপ্তির অনুভূতি দিতে পারে। উচ্চমাত্রার আঁশ হজমে সহায়তা করতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর?

সকালে চিয়া সিড খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি হতে পারে- ফলে অতিরিক্ত নাশতা বা খাবার গ্রহণ কমানোর ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু চিয়া সিড খেলেই ওজন কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিয়া সিডকে কোনো ‘ম্যাজিক ফুড’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষণায় চিয়া সিড একাই ওজন, রক্তচাপ, রক্তে চর্বি বা রক্তে শর্করার ওপর নির্দিষ্ট বড় ধরনের উপকার করে- এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং এটি উদ্ভিদভিত্তিক ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে উপকারী হতে পারে।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী?

চিয়া সিড উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড বা ALA-এর ভালো উৎস। ওমেগা-৩ হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে চিয়া সিডের ALA-কে মাছের EPA ও DHA-এর সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়, কারণ শরীরে ALA থেকে EPA ও DHA তৈরির প্রক্রিয়া সীমিত।

মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের নিবন্ধেও চিয়া সিডকে খাদ্যআঁশ ও ওমেগা-৩-এর ভালো উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধটির লেখক রোমি লন্ড্রে, RDN, CD জানান, খাদ্যআঁশ দীর্ঘ সময় তৃপ্ত রাখতে পারে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ কী?

হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের চিকিৎসক ও প্রধান মেডিকেল এডিটর ডা. হাওয়ার্ড ই. লিওয়াইন জানান, চিয়া সিড উদ্ভিজ্জ ALA ওমেগা-৩-এর একটি উৎস। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওমেগা-৩ শরীরের কোষীয় কার্যক্রম ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে, মায়ো ক্লিনিকের ডায়েটিশিয়ান ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আনিয়া গাই বলেন, সাধারণত চিয়া সিড গুঁড়া করে খাওয়ার প্রয়োজন নেই; গোটা বীজও খাওয়া যায়। তিনি সকালের সিরিয়াল, সালাদ বা স্মুদিতে চিয়া সিড যোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

খালি পেটে কীভাবে খাবেন?

চিয়া সিড সরাসরি শুকনো অবস্থায় বেশি পরিমাণে না খেয়ে পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া সুবিধাজনক। কারণ বীজটি তরল শোষণ করে ফুলে জেলির মতো হয়ে যায়। অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করে শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি, বিশেষ করে খাদ্যআঁশের পরিমাণ হঠাৎ বাড়ালে।

সকালে ভেজানো চিয়া সিডের সঙ্গে টকদই, ওটস, দুধ বা ফল যোগ করে পুষ্টিকর নাশতা তৈরি করা যায়। এতে শুধু চিয়া সিডের ওপর নির্ভর না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, চিয়া সিড নিঃসন্দেহে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি খাবার। খাদ্যআঁশ, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩-এর কারণে এটি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় জায়গা পেতে পারে। তবে “খালি পেটে চিয়া সিড খেলেই ওজন কমবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হবে বা সব রোগ দূর হবে”- এ ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অতিরঞ্জিত।

স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শরীরচর্চা ও সামগ্রিক জীবনযাপনের সঙ্গে চিয়া সিডকে যুক্ত করলেই এর পুষ্টিগুণ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *