পে স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের ‘না’

চলমান ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। বাংলাদেশেও এর চরম প্রভাব পড়েছে। তবে এ প্রভাব সামনের দিনগুলোতে আরো তীব্র হবে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোতে জ্বালানি ও খাদ্য সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। এ ছাড়া আগে থেকে চলে আসা আর্থিক সংকট তো রয়েছেই। ফলে এই মুুহূর্তে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আবার পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত যে অর্থের প্রয়োজন হবে তার জোগান দেওয়াও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করে আইএমএফ।

এ ছাড়া শুধুম সরকারি খাতে বেতন ভাতা বাড়ানো হলে বেসরকারি খাতে কর্মরতরা প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি। অথচ দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী বেসরকারি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন আপাতত পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ‍জানা গেছে।

সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে আইএমএফের এশীয় অঞ্চলের প্রধান কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকের সময় এ সুপারিশ করেছেন বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগের একটি সূত্র।

এদিকে বৈশ্বিক এই সংকট সামাল দিতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ থাকা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ ভর্তুকি খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের ব্যাংকঋণ অর্ধলাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত জুলাই-ডিসেম্বর শেষে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তার অর্ধেকের বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।

সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয় সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। এনবিআরের তথ্য মতে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই ঘাটতি বছর শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে সেটাও এখন অনুমান করা অসম্ভব বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।

এ জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ব্যাপারে ধীরে চল নীতি বেছে নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও সামান্য আলোচনা হয়েছে। অবশ্য সে প্রস্তাব পর্যালোচনা করারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সিপিডির পক্ষ থেকে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য এ জন্য আলাদা একটি কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, আগের সরকারের প্রস্তাবিত পে-কমিশনের প্রতিবেদনকে সরাসরি গ্রহণ না করে তা একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদেও শেষ সময়ে পে স্কেল সংক্রান্ত যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। এজন্য এ সরকারের নিজের মতো একটি কমিশন গঠন করে এটাকে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। এদিকে অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেহেতু বলেছেন, তাই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন এই বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে এখনই সব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এজন্য কিছুটা সময় নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ঈদের আগে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পে-কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে ডেকে বৈঠক করেন। সেখানে পে স্কেলের বাস্তবায়নের বিষয়ে চেয়ারম্যানের মতামত নেন। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কেও তাকে জানান অর্থমন্ত্রী।

জানা গেছে, রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক সংকটকে আমলে নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর জন্য একটি কমিশন গঠন করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি ড. ইউনূস সরকার। তবে পে-কমিশন যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সেই অনুযায়ী একটি বেতন কাঠামোর সুপারিশ মালা বর্তমান সরকারের সঙ্গে রয়েছে। যেটি করার ঘোষণা দিলেও এখনো শুরু করা হয়নি। তবে বাজেট প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে সেটি রিভিউ করা হতে পারে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *