পরীমনিকে কেন চেনেন না, জবাবে যা বললেন সিটি ব্যাংকের এমডি

মাদক মামলায় গ্রেফতার চিত্রনায়িকা পরীমনিকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দিয়েছেন সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন— সম্প্রতি গণমাধ্যমে এমন একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এ সংবাদকে মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর নিজেই। তার দাবি, গাড়ি উপহার দেওয়া তো দূরের কথা পরীমনির সঙ্গে কখনই দেখা হয়নি এ ব্যাংক কর্মকর্তার। পরীমনি বা পিয়াসা নামে কাউকে চেনেন না তিনি। গত জুনে ‘উত্তরা বোট ক্লাব’ ঘটনায় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে পরীমনি নামটা শুনেছেন মাত্র।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এ বিষয়ে গত রোববার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস লেখেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা।

এর পর থেকে তার এসব দাবিকে ‘মিথ্যা’ ও ‘লোক দেখানো’ বলে সমালোচনা করে অনেকে লিখেছেন, চিত্রনায়িকা পরীমনিকে কেন চেনেন না সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন? তিনি কি অন্য জগতে বসবাস করছেন? একজন সাহিত্যিক হয়ে ঢাকাই সিনেমার আলোচিত নায়িকার বিষয়ে কিছুই জানেন না, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য?

এবার সেসব সমালোচনা ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মাসরুর আরেফিন। মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি।

মাসরুর আরেফিন লিখেছেন, ‘আমি কী করে পরীমনিকে চিনি না, বা ‘বোট ক্লাব’ কাণ্ডের আগে কী করে আমি তার নামও শুনিনি?—শুনুন, আমি ঢঙ করে কথা বা ন্যাকামি ভরা ভালো-ভালো-লক্ষ্মী-লক্ষ্মী কথা বলার ধারে কাছের কোনো ক্যারেক্টার না। আমি তার নাম শুনিনি, তো আমি তার নাম শুনিনি। ব্যস। আমরা শাবানা-ববিতা-কবরী ছাড়িয়ে শেষমেশ শমী কায়সার-বিপাশা হায়াত পর্যন্ত ফলো করে হাঁপিয়ে যাওয়া জেনারেশন। এভাবে বাংলা রূপালী পর্দার সঙ্গে আমরা বহুদিন মোটামুটি সংযোগবিহীন। মাঝে নন-কমার্শিয়াল ভাল বাংলা ছবি যে কটা হয়েছে, তার সবই দেখেছি। কিন্তু সেসবের মধ্যে পরীমনি অভিনীত কোনো ছবি পাইনি, তাই দেখিনি। আপনারা দেখেছেন, আপনাদের সে প্রিয় নায়িকা, আপনারা তাকে চেনেন—ভাল কথা। আমি দেখিনি, আমার চেনার সময় হয়নি, আমার চেনার মতো কোনো চলচ্চিত্রে তিনি আসেননি, তাই আমি চিনি না। কথা শেষ।’

এর পর সিটি ব্যাংকের এমডি লেখেন ,‘সোশ্যাল মিডিয়ার প্রশ্ন এটাও যে, পরীমনির মতো বড় নায়িকাকে যিনি চেনেন না, তিনি আবার কী করে ‘সাহিত্যিক’ হন? মানে, তাহলে সমাজের পালসটা তিনি কী করে ধরতে পারেন?—দেখুন, সমাজ একটা বিরাট কড়াই। তাতে থানকুনি পাতা দিয়ে খলসে মাছের ঝোলের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব সম্পর্কিত আপনার বিশ্বাস, মসজিদ ও মন্দির সংক্রান্ত আপনার ভাবনা, বেগুনের কাঁটার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া রিকশার স্পোক আর এই মুহূর্তে ডেন্টাল সার্জনের হাতে উঠে আসা আপনার দাঁত আর সেই হঠাৎ নেই-হয়ে-যাওয়া দাঁতের হু-হু করে ওঠা কান্না, সবটা, সবটা—মুদ্রাস্ফীতি-জিডিপি-মানইজ্জত-বার্থ কন্ট্রোল পিল-আর্মির ট্রাক-কোকিলের কুউউউইসহ সবটা—সেই কড়াইতে একসাথে রান্না হচ্ছে। ওই বিশাল রান্নার কড়াইয়ে ফুটতে থাকা অতগুলো জিনিসের মধ্যে একটা মাত্র জিনিসের নাম ‘পরীমনি’। যাকে আপনি এ মুহূর্তে ‘দি পরীমনি ফেনোমেনন’-ও বলতে পারেন। মানে যার মধ্যে এই এখন আছে এক ব্যক্তি পরীমনির ওপর দিয়ে চলা সিস্টেমের গ্রাইন্ডিং মেশিনের গড়গড়গড়, যা এই এখন তাকে নিষ্ঠুরভাবে গুড়িয়ে-মাড়িয়ে-কেটে-চিড়ে-ছিঁড়ে দিচ্ছে। (এটাই হয়তো আপনার নৈতিকতার বিচারে ‘পরীমনি’ নামের এক চক্র বা বলয়ের লোভ ও লালসার যৌক্তিক পরিণতি।) আবার ওই একই ‘পরীমনি’ ফেনোমেননের অন্যদিকে? অন্যদিকে আছে একগাদা জিভ-বের-করা, লোল-ফেলা, চকচকে বড় গাল ফুলিয়ে হাসতে থাকা কিছু লোক, যারা পরীমনিদের কাছে বেড়াতে গিয়ে কল রেকর্ডে ধরা, ভিডিওতে ধরা, এতে ধরা, তাতে ধরা।
তো, লেখক হিসেবে ওই কড়াইয়ের ‘পরীমনি’ নামের তরকারিটুকু চিনতে আমার এই নির্দিষ্ট ‘পরীমনি‘-কেই চেনা বাধ্যতামূলক না। ওই তরকারি মানবসভ্যতার প্রথম থেকেই কড়াইতে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা এক তরকারি, স্বাদে যা চকলেটের খসখসে খোসার মতো, আবার ডালিম-ডালিমও (‘গিলগামেশ’-এ এক রাজা ডালিম খেতে খেতে একজন পা-খোঁড়া প্রজাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রজা, তোমার পায়ের অবস্থা কী?’ প্রজার উত্তর, ‘ডালিম-ডালিম।’—মানে রাজা মশাই, আমার পা-টা ভুজভুজ করছে, মানে বোমার মতো আপনার মুখ-গাল-ঘাড়-বুকজুড়ে ওটা ফেটেফুটে পড়বে।) ’

মাশরুর লেখেন,‘ সমাজের কড়াইয়ের নির্দিষ্ট ‘পরীমনি’ নামের ওই ডালিম-ডালিম স্বাদের তরকারি নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। সেটা এই অর্থে যে, ওই ডালিমের স্বাদ নেওয়াটা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়, আমি তা সম্মান করি। আমি নৈতিকতার পণ্ডিত না, সুবিধাবাদী মানুষের সুবিধামতো বানানো ভাল-মন্দের কোনো পতাকাবাহকও আমি না। এ ক্ষেত্রে কেবল এক জায়গায়ই সমস্যা আছে আমার, মানে যদি কথা ‘সত্যি’ হয়। সমস্যা এই যে, যারা ওই চক্রের হাতে পড়ে পরে ব্ল্যাকমেইলড্ হন, তারা যদি আবার রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম বা রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষজন হয়ে থাকেন, তাহলে সমূহ বিপদ। তাহলে বঞ্চিতের আরও বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা। এর বাইরে আর কোনো বিপদ দেখি না—এর বাইরে ব্যক্তিস্বাধীনতার ওই ডালিমের সবটাই লাল, ওই তরকারির সবটাই তাজা স্বাদের।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *